আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার চেয়ে নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিতগুলো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই বিবেচনায় বলা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বেইজিং সফর (সাত বছরের মধ্যে প্রথম) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক কোনো যুগান্তকারী সাফল্য না আনলেও এর তাৎপর্য মোটেও ছোট নয়। এই সফর আসলে দ্বন্দ্ব থেকে সংলাপে ফেরার এক সচেতন পদক্ষেপ।
পাঁচ বছর আগে গালওয়ান উপত্যকায় ২০ জন ভারতীয় সেনার প্রাণহানি দুই দেশের সম্পর্ককে গভীর সংকটে ফেলেছিল। অমীমাংসিত ও অস্থির সীমান্ত হয়ে উঠেছিল বৃহত্তর কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রতীক। ওই ঘটনার পর বাণিজ্য ধীর হয়ে যায়, বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয় আর এশীয় সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি বহনকারী সেই আশাবাদী শব্দবন্ধ—‘চিন্ডিয়া’ সন্দেহ আর অবিশ্বাসের কাছে হার মানে। কিন্তু আজ আবার সম্পর্ক পুনর্গঠনের যন্ত্র সচল হচ্ছে।
মোদি কোন বিশ্বাসে চীনের দিকে ঝুঁকলেন
এ বাস্তবতার এক সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো ফক্সকনের কারখানা থেকে ৩০০ জনের বেশি চীনা প্রকৌশলীর চলে যাওয়া। তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে আইফোন ১৭ তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই কারখানা।
ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, চাইলে বেইজিং কতটা সহজে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। চীন বিরল খনিজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে তার আধিপত্য কাজে লাগিয়ে ভারতের জন্য এসব খনিজ ও চুম্বক (যা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিকসের জন্য অপরিহার্য) রপ্তানি সীমিত করেছে। শুধু তা–ই নয়, ইলেকট্রনিকস অ্যাসেম্বলির যন্ত্রপাতি, ভারী টানেল বোরিং মেশিন, সৌর সরঞ্জামসহ উচ্চমানের বহু পুঁজিসামগ্রী রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চীন। এসব ভারতের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাই আসল পরীক্ষা লুকিয়ে আছে শীর্ষ বৈঠকের প্রতীকী অঙ্গভঙ্গিতে নয়। আসল পরীক্ষা লুকিয়ে আছে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার বাস্তবতায়।
এখনো আশার আলো আছে। ভারত আর চীন আবার বসে কথা বলা শুরু করেছে, মানুষের মধ্যে যোগাযোগও ফিরিয়ে আনছে আর আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোয় একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। এর মানে, তারা একে অপরকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে না, বরং সমস্যার সমাধান খুঁজতে আলোচনার সঙ্গী হিসেবেও ভাবছে।
আজকের দুনিয়ায় প্রতিযোগিতা এমনভাবে চলছে যে একজনের লাভ মানেই আরেকজনের ক্ষতি—মানে একেবারে শূন্য-সাম্যের খেলা। কিন্তু ভারত-চীনের এই বদলানো দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছে, তারা একসঙ্গে জেতার পথ খুঁজছে। তাই এটাকে একধরনের বিজয় বলা যায়।
মনে হচ্ছে, ‘চিন্ডিয়া’র চেতনা আবারও জেগে উঠছে। জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। সতর্কভাবে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই। আশা করা যায়, এই চেতনা দীর্ঘস্থায়ী হবে